ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ: বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় ক্যাডেট কলেজের গল্প

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ: বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় ক্যাডেট কলেজের গল্প

  • ক্যাডেট কলেজ পরিচিতি
ফাহিম শাহরিয়ার

ফাহিম শাহরিয়ার

September 16, 2026

ভূমিকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রথম ক্যাডেট কলেজ— ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্যাডেট কলেজ ব্যবস্থার পথিকৃৎ হিসেবে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ইতিহাস জানা প্রতিটি বাংলাদেশির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠা

তখনকার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কলেজটি ১৯৫৮ সালের ২৮ এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কুরবান আলীর হাতে উদ্বোধন হয়। প্রথম ব্যাচে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের দুই ছেলেও ছিলেন।

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এই কলেজটি "ইস্ট পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজ" নামে পরিচিত ছিল, যতদিন না আরও তিনটি নতুন ক্যাডেট কলেজ (ঝিনাইদহ, মির্জাপুর ও রাজশাহী) প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন নিউজিল্যান্ড সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্যার উইলিয়াম মরিস ব্রাউন, যিনি প্রায় সাত বছর এই দায়িত্ব পালন করেন।

অবস্থান ও ক্যাম্পাস

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায়, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। ১৮৫ একর জমির এই বিশাল ক্যাম্পাস একে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে পরিণত করেছে। সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এখানকার প্রকৃতি অসাধারণ সুন্দর, যা ক্যাডেটদের পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও দেয়।

কলেজের বীর শ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর একাডেমিক ব্লক এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপনা, যা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক বীরের স্মরণে নামকরণ করা হয়েছে।

শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফল

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এই কলেজে সপ্তম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ইংরেজি মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা হয়। বছরের পর বছর ধরে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক ভালো ফলাফল করে আসছে, যা এই কলেজকে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাতারে রেখেছে।

সহশিক্ষা কার্যক্রম ও ঐতিহ্য

পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যাডেটদের নিয়মিত পিটি, প্যারেড, খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। "কথা নয়, কাজ" (Deeds not Words) — এই মূলমন্ত্র নিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের ক্যাডেটদের রয়্যাল ব্লু রঙের পরিচয় আজও ধরে রেখেছে তাদের ঐতিহ্য। এই কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের "ফৌজিয়ান" (Faujian) নামে ডাকা হয়।

ভর্তি প্রক্রিয়া

দেশের সব ক্যাডেট কলেজের মতোই ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে হয় জাতীয় পর্যায়ের কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনলাইনে আবেদন শুরু হয় এবং জানুয়ারিতে লিখিত, মৌখিক ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

উপসংহার

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজ ব্যবস্থার সূচনাবিন্দু ও গর্বের প্রতীক। ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কলেজ দেশকে দিয়ে চলেছে দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক।


তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কলেজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (fcc.army.mil.bd)

← সব আর্টিকেল পড়ুন